অনলাইন ক্লাস –  কারা বাদ পড়বে মনে রাখছি তো?

Rightsidepost রাজ্য
অমিত দে -একটা গল্প শোনা যাক। ধরে নিই পৃথিবীর বয়স অন্তত আরো অর্ধ শতাব্দী বেড়ে গেছে।সকালবেলা দুই ভাইবোন দুধ খেতে খেতে ভারী খুনসুটি করছে।তাদের মা তাড়া দিচ্ছেন দুজনকেই।”নটা বাজে, এখনই ক্লাস শুরু হয়ে যাবে, চটপট করো।”কথাটা শুনে তারা নিঃশব্দে ঢুকে গেলো স্কুল রুমে।
চালু হয়ে গেল এক যন্ত্র আর তার স্ক্রিনে ভেসে উঠলো শিক্ষকের মুখ।একটা স্লটে তারা হোম টাস্ক জমা দিলো, অন্য আর এক স্লট দিয়ে বেরিয়ে এলো আগের দিনের সংশোধিত কাজ।এর পরে একে একে চললো ইংরাজি, ইতিহাসের ক্লাস।ভূগোলের সময় যন্ত্র গেলো বিগড়ে।মা এসে বললেন,”এটা না সারানো পর্যন্ত তোমাদের ছুটি।”তারা ছুট লাগালো ছাতে।বোনটি হঠাৎ দেখে দাদা নেই।খুঁজতে খুঁজতে তাকে পাওয়া গেলো চিলে কোঠায়।কী একটা পুরোনো বই, হলদে হয়ে গেছে তার পাতা গুলো, সেটা মন দিয়ে পড়ছে।”ওটা কি রে দাদা?”দাদা বললো দেখ দাদুদের ছোট বেলার স্কুলের গল্প।তখন স্কুল ছিলো একটা বাড়ি।অনেক ছেলেমেয়ে একসঙ্গে হৈ হৈ করে সেখানে পড়তে আসতো।আর যিনি পড়াতেন তিনি ছিলেন সত্যি একজন মানুষ, ছবি নয়।ছেলেমেয়েরা একসাথে টিফিন খেতো, খেলতো।পড়ার ব্যাপারে একজন আরেকজনকে সাহায্য করতো,দুষ্টুমিও করতো।কী মজা ছিলো, তাই না?
থাক গল্পটি আর বাড়াবো না। দরকারও নেই। আমরা বুঝতে পারছি স্কুল শুধু পড়া বোঝার জায়গা নয়, বন্ধু হয়ে ওঠার প্রথম পাঠও এখানেই পাই।স্কুলের উঠোনেই আসলে  প্রথম পা রাখি সমাজ জীবনে।অনলাইন পাঠে এসব কোথায় পাবো? শুধু সিলেবাস টুকু জানলেই হবে! এই  তো সেদিন শুনলাম অনলাইনে ক্লাস করতে করতে শিক্ষিকা হঠাৎ পুজোর ঘন্টার শব্দ শুনে অবাক হয়ে এদিক ওদিক নজর করে দেখেন এক দুষ্টু তার মায়ের পুজো করার ঘন্টাটি লুকিয়ে নিচ্ছে।যাক গে এসব কথা।আসল কথা হলো আমার দেশে শতকরা ৭৫ ভাগ ছাত্রছাত্রীদের বাড়িতে কোনও ইন্টারনেট সংযোগ নেই। এটি তথ্য। এদিকে সাম্প্রতিক খবরে প্রকাশ উচ্চ শিক্ষার ক্ষেত্রেও ইউ জি সি জানিয়েছেন যে শতকরা ৪০ভাগ ক্লাস অনলাইনে হতে পারে।বিষয়টি জেনে যদি কেউ ভাবেন যে প্রথম বিশ্বের গন্ধ পাওয়া যাচ্ছে, সাবাশ ডিজিটাল ইন্ডিয়া, তা হলে বাধ্যত বলতে হয় আমরা শুধু মাত্র মূর্খের স্বর্গে বাস করছি তাই নয়, সত্য উপলব্ধিতেও আমরা অক্ষম। ( বাস্তবে দেখা যাচ্ছে অনলাইন ক্লাসে ছাত্রসংখ্যার উপস্থিতি ১০ শতাংশ থেকে ২০ শতাংশ)
শিক্ষা যে সমাজ সম্পদ একথা অনস্বীকার্য । এদেশে বোধহয়  ক্লাস রুমই একমাত্র স্থান যেখানে শিক্ষা সম্পদ শিক্ষকের মাধ্যমে সমভাবে বণ্টিত হয়, অবশ্য যদি ক্লাস রুম পর্যন্ত পৌঁছন যায়।এবার সেই সম্পদের সমানাধিকার থেকে ৭৫ শতাংশ শিক্ষার্থী বঞ্চিত হবেন।
মানছি ,বর্তমানে এই অতিমারীর আবহে উপায়ান্তর পাওয়া দুরূহ।
আমি বলতে চাই আমাদের শিক্ষার্থীদের বাস্তবচিত্রটি কী এই ব্যবস্থা গ্রহণের আগে ভাবা হয়েছিলো?তাহলে কি সরকারী ব্যবস্থাপনায় শিক্ষার্থীদের বিনামূল্যে ইন্টারনেট সংযোগদান অসম্ভব ছিলো? এ প্রশ্নগুলি ভাবায় আমাদের।
মনস্তাত্ত্বিক ভাবে আমরা যা চাই, তার স্বপক্ষেই ভাবি, তার অন্যদিক তখন আর চোখে পড়ে না।আমরা ক্লাস করতে হবে ভেবেছি, কিন্তু তার আওতায় সকলকে আনতে পারছি কি না সেই সমগুরুত্ব সম্পন্ন প্রশ্নের উত্তর খুঁজিনি।
শুনেছি ছাত্রছাত্রীরাই এ ভাবনা ভাবছেন।এই ভাবনা তারুণ্য ভাবে বলেই তাদের কাছে স্বপ্নগুলো গচ্ছিত রাখতে চাই।
Share this: